২১ ফেব্রুয়ারির পরিবর্তে ২০ সেপ্টেম্বর মাতৃভাষা দিবস চালুর প্রচেষ্টা বিজেপির

আন্তর্জাতিক ডেস্কঃ ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে জাতিসংঘের স্বীকৃতি পেলেও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিরোধী দল বিজেপি ওই রাজ্যে ২০ সেপ্টেম্বরকে এই দিবস হিসেবে পালন করেছে। এর যুক্তি হিসেবে দলটি বলছে, দুই বছর আগে এই দিনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলার একটি স্কুলে উর্দু শিক্ষক নিয়োগের প্রতিবাদে জনতার বিক্ষোভে পুলিশ গুলি চালায়। এতে বিজেপির দুইজন কর্মী নিহত হন। তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতেই এই দিনটি মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করছে তারা। এজন্য বিভিন্ন সামাজিক মিডিয়ায় জোরালো প্রচারণা চালানো হয়েছে। উর্দু এবং আরবির প্রভাবে পশ্চিমবঙ্গে বাংলা ভাষা বিপন্ন বলেও যুক্তি দেখাচ্ছে দলটি।

তবে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেসসহ রাজ্যের সাহিত্যিক বা ভাষাবিদদের অনেকেই বিজেপি‘র এই উদ্যোগের সঙ্গে একমত নয়। তৃণমূল কংগ্রেস মনে করছে, ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবসের জায়গায় নতুন এই দিবসের আমদানি  ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা ছাড়া কিছুই নয়।

বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বস্তুত পূর্ব পাকিস্তানে বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে জাতিসংঘ যে ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, বাংলাদেশ তথা বাকি বিশ্বের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গও সেই দিনটিকেই মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। এছাড়া ৬১ সালে বরাক উপত্যকার ভাষা শহীদদের স্মরণে প্রতি বছর ১৯মে পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু অনুষ্ঠান হয়।

তবে বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ গত কয়েকদিন ধরেই ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়াতে জোরালো প্রচার চালান, এখন মাতৃভাষা দিবস পালন করা উচিত ২০ সেপ্টেম্বর। কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, রাজ্যে উর্দুর আগ্রাসনের প্রতিবাদে এই দিনেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন দাড়িভিটের বিজেপি সমর্থক দুই যুবক তাপস বর্মন ও রাজেশ সরকার।

পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির প্রধান মুখপাত্র ও সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসুর কথায়, ‘এ রাজ্যে ২১ ফেব্রুয়ারিকে মাতৃভাষা দিবস করেছে বামপন্থী ও কংগ্রেসিরা। ওটা বাংলাদেশের ঘটনা, তার সঙ্গে এ রাজ্যের কোনও সম্পর্ক ছিল না।’ তিনি বলেন, ‘যদিও আমরা ২১শে ফেব্রুয়ারিকে অস্বীকার করছি না, তবু সাম্প্রতিককালে রাজ্যে উর্দু চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে দাড়িভিটে রাজেশ-তাপসের বলিদানের ঘটনাই কিন্তু আমাদের বেশি মনোযোগ দাবি করে। এইযে আজ পশ্চিমবঙ্গে জলের পরিবর্তে পানি, রামধনুর পরিবর্তে রংধনু, আকাশের পরিবর্তে আসমান বা পিসির পরিবর্তে ফুপি চাপিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাপার-স্যাপার চলছে, তাতেই বোঝা যায় বাংলা ভাষা আক্রান্ত। তৃণমূলের আমলে উর্দু আর আরবির এই দাপটের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতেই আমাদের উদ্যোগ।’

পশ্চিমবঙ্গের সুপরিচিত লেখিকা জয়া মিত্র মনে করেন, অন্য কোনও ভাষাকে আক্রমণ করে কখনওই কোনও মাতৃভাষা দিবস উদযাপন করা যায় না। যদি এটার নাম মাতৃভাষা দিবস দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এ রাজ্যে (পশ্চিমবঙ্গে) যাদের যাদের মাতৃভাষা উর্দু, তাদের কী হবে? কিংবা যাদের মাতৃভাষা তামিল বা হিন্দি, তাদেরই বা কী হবে?’ তিনি বলেন, ‘আসলে মাতৃভাষা দিবস উদযাপন মানে অন্য কোনও ভাষাকে ঘৃণা করা কিছুতেই নয়।’

ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেসের সিনিয়র এমপি ও মুখপাত্র কাকলি ঘোষ দস্তিদার মনে করেন নতুন তারিখে মাতৃভাষা দিবস পালন আসলে বিজেপির একটা পুরনো কৌশলের অংশ। তিনি বলেন, ‘বিজেপি যেভাবে ইতিহাস বদলে দেয়ার খেলায় নেমেছে, এটাও সেরকমই একটা চেষ্টা।

কাকলি ঘোষ দস্তিদারের দাবি, মূলত হিন্দি বলয়ের দল বিজেপির প্রধান নেতারা কেউ বাঙালি নন, বাংলার সঙ্গেও দলটার কোনও আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ওনারা বাংলায় আসেন এবং হিন্দি বা গুজরাটিতে ভাষণ দিয়ে চলে যান- পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মোটেও সেটাকে ভাল চোখে দেখেন না। কেননা মানুষের হৃদযন্ত্রে পৌঁছাতে গেলে তার ভাষা, আচার, রীতিনীতি দিয়েই পৌঁছাতে হয় যেটা তারা এখনও শিখে উঠতে পারেননি। ওনাদের ভাষণও তাই অর্ধেক লোকে বোঝেন না। কিন্তু তাদের প্রচুর টাকা আছে বলে লোকসভা নির্বাচনে প্রচুর অর্থ ছড়াতে পেরেছেন। আর এখন রাজ্যে নিজেদের পায়ের তলায় জমি খুঁজতে বাঙালি আবেগে সুড়সুড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’

এই বিভাগের আরও খবর
Loading...