শেরশাহর ত্রাস ‘মাইকেল পারভেজ’ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার

ধরা ছোঁয়ার বাইরে দিদার-মহিউদ্দিনসহ মামলার ২৫ আসামি

মেহেদী হাসান কামরুলঃ নগরের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকা বায়েজিদ-শেরশাহ। মূলত নিম্ন আয়ের মানুষগুলোর বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীর বাস শেরশাহতে। চাঁদাবাজি, আধিপত্যবিস্তার, সরকারি খাস জমি দখল, পাহাড় কাটা, ফুটপাত দখলসহ সব অপরাধের অভয়ারণ্য এই এলাকা। এখানে সামান্য ঘটনা থেকে ঘটছে হত্যাকাণ্ড।

গত বছরের ৩১ ডিসেম্বর রাতে আধিপত্য বিস্তার ও চাঁদাবাজির ঘটনার প্রতিবাদ করায় খুন হন হকারলীগের সদস্য ও চটপটির দোকানদার রিপন। এ ঘটনার পর ২৮ জনকে আসামি করে মামলা করা হলে পুলিশ তাৎক্ষণিক দুইজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে হামলায় নেতৃত্ব দানকারী অপর আসামি এমদাদ বায়েজিদের মাঝেরঘোনা এলাকায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন।

শেরশাহর ত্রাস ‘মাইকেল পারভেজ’ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার

ওই বন্দুকযুদ্ধের পর থেকে শেরশাহ ছেড়ে পালিয়েছেন এই মামলার এজাহার নামীয় সকল আসামি। মামলার প্রধান আসামিরা হলো- দিদারুল আলম ওরফে ভূমি দস্যু দিদার, আবু মহিউদ্দিন, জসিম পাটোয়ারী ওরফে পানি জসিম, ‍মিল্টন বড়ুয়া, ফয়সাল ওরফে ডিবি ফয়সাল, মহিউদ্দিন তুষার, রফিক ওরফে মাছ রফিক।

মামলার বাকি আসামিরা হলো- এমদাদ (ক্রসফায়ারে নিহত), ইকবাল সারজিল বাবু, ফজল আমিন ওরফে বিহারী ফজল, সেলিম বাদশা, মানিক, আশিকুর রহমান খোকন ওরফে বোমা খোকন, নুর হোসেন মুরাদ, নবাব সিরাজউদ্দৌলা, সোহেল, আনোয়ার, সানী, শেখ ফজলে রাব্বি ওরফে টোকাই রাব্বী, মোঃ মমিন, শওকত উল্লাহ, মোঃ পারভেজ ওরফে মাইকেল পারভেজ, শিপন, রায়হান, জাহাঙ্গীর, সাব্বির, হৃদয় ও শুভ।

শেরশাহর ত্রাস ‘মাইকেল পারভেজ’ ডিবির হাতে গ্রেপ্তার

সর্বশেষ গতকাল শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় এই মামলার এজাহার নামীয় আরেক আসামি পারভেজ ওরফে মাইকেল পারভেজকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি-উত্তর) চাঁদগাও থেকে গ্রেপ্তার করে।

মাইকেল পারভেজ শেরশাহর দিঘীর পাড় এলাকায় কালাম মুন্সির ছেলে। পেশায় স্টুডিও দোকানদার পারভেজ দিদার মহিউদ্দীনের ছত্রছায়ায় ত্রাসের রাজত্ব শুরু করেন। গড়ে তোলেন নিজস্ব কিশোর গ্যাংসহ ‘ক্রাইমজোন’ বলয়। পারভেজের কিশোর গ্যাংয়ের অন্যন্য সদস্যরা হলো- এসকে রাব্বি, রায়হান ওরফে দুধ রায়হান, তাম্মি, শিপন, রাকিব, বোমা খোকন (এজাহার নামীয় আসামি), বাদশা ওরফে মিডা বাদশাসহ অন্তত ১২ জন।

 

স্থানীয়রা জানায়, মাইকেল পারভেজ তার বড় ভাই আরিফকে সাথে নিয়ে শেরশাহতে ‘আরিফ স্টুডিও’ নামে একটি ব্যবসা করতো। কিছুদিন দোকান করার পর দিদার-মহিউদ্দনের অশুভ আর্শীবাদে জড়িয়ে পড়েন চাঁদাবাজি, খুন-খারাপি, দখলবাজিতে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শেরশাহর একজন জানান, পারভেজের শেরশাহতে দলীয় কার্য্যালয়ের সামনের তার দোকান ছিলো। পরে এশিয়ান গার্মেন্টসের সামনে জোরপূর্বক  জমি দখল করে সেখানে দোকান স্থানান্তর করেন। রিপন হত্যাকান্ডে তার নামে মামলা হলে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়।

মহানগর গোয়েন্দা (উত্তর) পুলিশের উপ-পরির্দশক (এসআই) মো. ‍ইমাম হাসান মাইকেল পারভেজকে গ্রেপ্তারের সত্যতা নিশ্চিত করে চট্টলার খবরকে জানান, পারভেজ দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর তাকে গতকাল সন্ধ্যায় গ্রেপ্তার করি। এই মামলার বাকি আসামিদের গ্রেপ্তার করতে আমাদের অভিযান অব্যাহত আছে।

মামলার বর্তমান অবস্থা জানতে কথা হয় রিপনের বড় ভাই আজাদের সাথে। তিনি চট্টলার খবরকে জানান, মামলাটি বর্তমানে ডিবি তদন্ত করছে। ভাইকে তো চিরদিনের জন্য হারিয়েছি। এখন শেরশাহ এলাকায়ও বের হতে পারি না।

মামলায় ন্যায় বিচার পাওয়ার সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের বিষয়টা নিয়ে এখন সবাই অপরাজনীতি করার চেষ্টা করছে। নানা জনে নানা কথা বলছে। কেউ কেউ বলছে দিদার মহিউদ্দীনসহ ৭ আাসামিকে তালিকা থেকে বাদ দিয়ে তাদের কাছ থেকে ৪০ লাখ টাকা নিয়েছি। কেউ বলছে ২৫ লাখ টাকা নিয়েছি। কেউ কেউ বলছে ১৬ লাখ টাকা নিয়েছি। এতো টাকা নিলে আমার পরিবারের আজ এই দূরাবস্থা কেন? আমি কেন শেরশাহতে নিরাপদে বের হতে পারছি না? আমি ছোট একটা ফলের দোকান করতাম সেটা কেন চালাতে পারছি না? এই প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়েন তিনি।

রিপনের ভাই আজাদ আরও বলেন, দিদার-মহিউদ্দিন এখন এলাকাতে নাই। বর্তমানে যারা আছে তারা বিভিন্ন বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। আমি আপনাদের মাধ্যমে প্রশাসনের কাছে ‍সুষ্ঠু বিচার দাবী করছি।

তবে কিছুটা ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন নিহত রিপনের স্ত্রী রাশেদা বেগম। মামলার বাদী রিপনের বড় ভাই আজাদ চট্টলার খবরের কাছে দিদার মহিউদ্দীনসহ ৭ আসামিকে বাদ দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করলেও রাশেদা বেগম ৭ আসামিকে বাদ দেয়ার কথাটি স্বীকার করেছে।

তিনি বলেন, আমার ভাসুরসহ (আজাদ) চট্টগ্রাম আদালতে গিয়ে দিদার মহিউদ্দিন সহ ৭ আসামিকে এই মামলা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন করেছি। তবে আদালত এখনও সেটা আমলে নেয়নি।

দিদার-মহিউদ্দীন আপনার স্বামীর হত্যার আসামি। তাদেরকে মামলা থেকে বাদ দেয়ার আবেদন কেন করলেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, দিদার মহিউদ্দীনকে ঘটনার দিন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায় নি। তাই বাদ দেয়ার আবেদন করেছি।

দিদার মহিউদ্দীনকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে মামলা থেকে বাদ দেয়া হচ্ছে। এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, টাকা পয়সার বিষয়টি জানি না। আমি কারও কাছ থেকে কোন টাকা পয়সা নেই নি। আমার ভাসুর (আজাদ) নিয়েছে কিনা সেটাও আমি বলতে পারি না।

অন্যদিকে এই হত্যাকান্ডের সত্য রহস্য উন্মোচন করতে রিপনের বন্ধূ ঈসমাঈল, আলামিন ও কবিরকে র্যা ব কিংবা পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন রিপনের স্ত্রী রাশেদা বেগম। তিনি বলেন, ঘটনার প্রত্যক্ষ সাক্ষী আল-আমিন। সে ওই সময় ঘটনাস্থলে ছিলো। সেদিন কি হয়েছে না হয়েছে সব আলামিন বলতে পারবে। কিন্তু আলামিন মুখ খুলছে না। বাকি দুজনও চুপ আছে।

ঘটনার দিন রাতে রিপনের সাথে আহত হয় তার বন্ধু আল-আমিন। আল-আমিন বলেন, আমাকে লোহার এঙ্গেল দিয়ে পেটানো হয়েছে। রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিলাম। পরে চট্টগ্রাম মেডিকেলে চিকিৎসা নেই। কারা হামলা চালিয়েছে জানতে চাইলে অদৃশ্য কোন কারনে আলামিন কারও নাম বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে ঘটনার একটি পূর্নাঙ্গ সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশের কাছে সংরক্ষিত আছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিগত ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বায়েজিদ-শেরশাহ এলাকায় খুন হয়েছেন অন্তত নয়জন। গত এক বছর ধরে অশান্তি অবস্থা বিরাজ করছে শেরশাহ বায়েজিদে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে চলছে পাল্টাপাল্টি হামলা-মামলা। আর এসবের নাটের গুরু হয়ে কাজ করছেন শেরশাহর দিদার-মহিউদ্দীন।

এই বিষয়ে র‌্যাব-৭ এর কমান্ডিং অফিসার (সিইও) লেফটেন্যান্ট কর্ণেল মশিউর রহমান জুয়েল চট্টলার খবরকে জানান, দিদার-মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। র‌্যাব সেটা অবগত। মামলার পর থেকে তারা আত্মগোপনে চলে যায়। যার কারনে তাদের অবস্থান সর্ম্পকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।তবে র‌্যাবের নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট আসামিদের আইনেরে আওতায় আনা হবে।

এই বিভাগের আরও খবর
Loading...