সিনহা হত্যা: গণশুনানিতে পুলিশের বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক : সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ হত্যার বিষয়ে গণশুনানিতে পুলিশের বিভিন্ন হয়রানিমূলক কৃতকর্মের বর্ণনা দিয়েছে স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা। এ সময় উৎসুক জনতার ভিড় ছিল লক্ষণীয়।

এই শুনানিতে শামলাপুর চেকপোস্ট এলাকায় অবস্থিত হেফজখানার কয়েকজন শিক্ষার্থী যারা মসজিদের ছাদ থেকে সেদিনের সংঘটিত ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছে তারা সব তুলে ধরেছে। নিহতের ওই দিন বিভিন্নভাবে যেসব প্রত্যক্ষদর্শী ঘটনা দেখেছিলেন তারা সাক্ষ্য প্রদান করেছে শুনানিতে অংশ নিয়ে।

রোববার (১৬ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শামলাপুর মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন রোহিঙ্গাদের সেবায় নিয়োজিত সিআইসি অফিসে গণশুনানি বা গণসাক্ষী অনুষ্ঠিত হয়। শুনানিতে ছাত্র, শিক্ষকসহ স্থানীয় ১২ জন ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হন। সেখান থেকে ৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ করে তদন্ত কমিটি। বিকাল ৫টায় গণশুনানি শেষ হয়।

সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে বিকাল সোয়া ৫টার দিকে সাংবাদিকদের এ কথা জানান সিনহা হত্যার ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান চট্টগ্রাম অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মিজানুর রহমান।

তিনি বলেন, অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই নয়জন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। তারা সেই দিনের ঘটনা সম্পর্কে যা অবলোকন করেছেন তা আমাদের জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করার হয়েছে। তাদের বক্তব্য মেজর (অব.) সিনহা হত্যার ঘটনায় চলমান তদন্ত কার্যক্রমে সংযুক্ত করা হবে।

স্থানীয় জনতার দাবি, গণশুনানির মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত বিষয়ের উদঘাটন করা দরকার। অদূর ভবিষ্যতে এরকম ঘটনা যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সে বিষয়ের নিশ্চয়তা চায় তারা। একই সাথে অতীতের বিচার-বহির্ভূত হত্যা ‘কথিত বন্দুকযুদ্ধে’ মাদক কারবারি নিহতের পর অনেক নিরপরাধ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে, তদন্তসাপেক্ষে সেই মিথ্যা হয়রানিমূলক মামলা থেকে যাচাই-বাছাই করে নিরপরাধ ভুক্তভোগীদের রেহায় দিতে

সরকারের প্রতি দাবি জানান স্থানীয় জনতা।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় নিরপরাধ মানুষকে মাদক, অস্ত্র, মানবপাচার, ডাকাতিসহ বিভিন্ন মামলায় হয়রানি করা হয়। থানা পুলিশের সহায়তায় অপরাধীরা অনেক সময় নিরীহ লোকজনকে অপরাধী বানিয়ে ছাড়ে। অনেকে বাড়ি-ঘর, জমিজমা, গরু-ছাগল বিক্রি করে এখন প্রায়ই নিঃস্ব।

তাদের দাবি, মাঠ পর্যায়ে তদন্ত করে মিথ্যা মামলাগুলো প্রত্যাহার করতে হবে।
শুনানিতে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক ও চট্টগ্রামের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান, রামু ১০ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মনোনীত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লে. কর্নেল সাজ্জাদ, চট্টগ্রামের ডিআইজি মনোনীত অতিরিক্ত ডিআইজি জাকির হোসেন এবং কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাজাহান আলি উপস্থিত ছিলেন।

স্থানীয় সূত্র জানায়, রবিবার সকাল সাড়ে ৯টা থেকে গণশুনানি স্থলে আসতে শুরু করেন সবাই। বক্তব্য দিতে আগ্রহীরা নাম রেজিস্ট্রেশন বুথে যান। গণশুনানি উপলক্ষে মেরিন ড্রাইভের শাপলাপুর এলাকা, ক্যাম্পস্থল এবং আশপাশে কঠোর নিরাপত্তা বলয় তৈরি করে সেনাবাহিনী ও অন্যান্য শৃঙ্খলাবাহিনী। বিপুল পরিমাণ গণমাধ্যমকর্মীও উপস্থিত হন সেখানে। আশপাশে তাদের যাতায়াত অবাধ থাকলেও শুনানি কক্ষে গণমাধ্যমের কাউকে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সিনহা হত্যাকাণ্ডে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর জানার চেষ্টা করেন তদন্তকারীরা। এর মাঝে এ হত্যাকাণ্ড পরিকল্পিত, নাকি তাৎক্ষণিকভাবে ঘটেছে। কার নির্দেশে সিনহাকে গুলি করেছিলেন লিয়াকত। ঘটনার সময় আদৌ সিনহার হাতে অস্ত্র ছিল কিনা, এসব অতি গুরুত্বপূর্ণ।

সূত্র মতে, টেকনাফ থানার সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ কক্সবাজারের পুলিশ সুপারকে ফোন করে বলেছিলেন, তিনি সিনহাকে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু গুলি করার আগে লিয়াকত ওসি না অন্য কারও কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছিলেন, সে ব্যাপারে আরও সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছে তদন্তকারী দল।

উল্লেখ্য, গত ৩১ জুলাই রাতে পুলিশের গুলিতে নিহত হন অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা সিনহা মোঃ রাশেদ খান। এ ঘটনায় নিহতের বোন শাহরিয়ার শারমিন ফেরদৌস বাদী হয়ে গত ৫ আগস্ট টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ও বাহারছড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত আলীসহ ৯ পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

আসামিরা হলেন- টেকনাফ থানার বরখাস্ত হওয়া ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) প্রদীপ কুমার দাশ, টেকনাফের বাহারছড়া শামলাপুর পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের প্রত্যাহার হওয়া পরিদর্শক লিয়াকত আলী, উপপরিদর্শক (এসআই) নন্দদুলাল রক্ষিত, সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, পুলিশ কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. মোস্তফা ও এসআই টুটুল। এদের মধ্যে আসামি মোস্তফা ও টুটুল পলাতক।

এর মধ্যে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়া পুলিশের চার সদস্য এবং এ ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার তিন সাক্ষীকে গত শুক্রবার থেকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছে র্যাব।

যাদের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে তারা হলেন– সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) লিটন মিয়া, কনস্টেবল সাফানুর রহমান, কামাল হোসেন, আবদুল্লাহ আল মামুন, পুলিশের দায়ের করা মামলার সাক্ষী মো. নুরুল আমিন, মো. নেজামুদ্দিন ও মোহাম্মদ আয়াছ।

এর আগে একই ঘটনায় টেকনাফ থানায় দুইটি, রামু থানায় একটি মামলা করেছে পুলিশ। এই ৩টি মামলায় আসামি করা হয়েছে সিনহার সঙ্গি সাহেদুল ইসলাম সিফাত ও শিপ্রা রাণী দেবনাথকে। তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

এসএএস/

এই বিভাগের আরও খবর
Loading...